জাপান থেকে শুরু করে ব্রিটেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—মার্চে বিশ্বজুড়ে কারখানাগুলোর কার্যক্রমে মন্দা দেখা গেছে। কারণ এ সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন মার্কিন শুল্কের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন বাড়তে দেখা গেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত বৈশ্বিক এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর রয়টার্স।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল তার ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ উপলক্ষে নতুন শুল্ক প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা। তিনি আমেরিকার নির্মাণ শিল্প পুনরুদ্ধারের জন্য এ শুল্ক আরোপ করতে চাচ্ছেন। এর আগে তিনি অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও অটোমোবাইলের ওপর শুল্ক বসিয়েছেন। পাশাপাশি চীনের সব পণ্যের ওপর আরোপ করেছেন বাড়তি শুল্ক।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘কোনো দেশই শুল্ক থেকে ছাড় পাবে না।’ হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘ট্রাম্প বুধবার শুল্ক ঘোষণা করার পর তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।’
ট্রাম্প সোমবার রাতে জানিয়েছেন, তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি বলেন, ‘শুল্কগুলো অন্য দেশের তুলনায় কম হবে এবং বিশ্বের প্রতি তাদের একটি দায়িত্ব আছে।’ নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, কভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার পথে থাকা বিশ্ব অর্থনীতিকে যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের কারণে নানা সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে, তখন এ শুল্ক নতুন করে ধাক্কা দেবে বাণিজ্য ভারসাম্যকে।
আসন্ন শুল্ক ও বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসার মনোভাবকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে বিভিন্ন অঞ্চলে। এশিয়ার কারখানাগুলোর কার্যক্রম মূলত দুর্বল হয়ে পড়ার কারণও এটি। গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্সের (পিএমআই) জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত এক বছরে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমেছে জাপানের কারখানাগুলোর কার্যক্রম। দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প খাতেও দেখা গেছে মন্দা। উৎপাদন হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে তাইওয়ানেও। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির কারখানাগুলোর কার্যক্রম এ সময়ে বাড়তে দেখা গেছে। কারণ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে পণ্য পাঠানোর জন্য চীনে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বছরের প্রথম দুই মাসে কারখানাগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণ হলেও মার্চে উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের (আইএসএম) রিপোর্ট অনুসারে, মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই ৫০ দশমিক ৩ থেকে কমে ৪৯-এ নেমে এসেছে। পিএমআই ৫০-এর নিচের যেকোনো স্কোর উৎপাদন সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। নতুন অর্ডারের উপসূচকটি ২০২৩ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান ইভান্স-প্রিচার্ড বলেন, ‘এসব ফলাফল থেকে বোঝা যাচ্ছে যে চীনের শিল্প খাত শুল্কের আগে সরবরাহ বাড়ানোর সুবিধা পাচ্ছে। তবে এটি বেশি দিন স্থায়ী হবে না। কারণ শিগগিরই সুবিধার পরিবর্তে শিল্প খাতের জন্য একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে মার্কিন শুল্ক।’
এ শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে সরবরাহ বাড়ানোর প্রবণতা ইউরোপের দীর্ঘদিনের মন্দার মধ্যেও শিল্প খাতে অল্প স্বস্তি এনে দিয়েছে। ইউরোজোনের ২০টি দেশের শিল্প খাতের উৎপাদন দুই বছরের মধ্যে এবারই প্রথমবারের মতো বেড়েছে। তবে সুবিধার বিপরীতে বোঝা হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন হামবুর্গ কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ সাইরাস ডেলা রুবিয়া। তিনি বলেন, ‘ইউরোপে শিল্প খাতে পরিবর্তনের একটি বড় অংশ মার্কিন শুল্কের আগে অর্ডার বাড়ানোর কারণেই হয়েছে। ফলে আগামী মাসগুলোয় কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।’
ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানি প্রায় দুই বছর পর উৎপাদন বৃদ্ধির স্বাদ পেয়েছে। সেই সঙ্গে ফ্রান্সের শিল্প খাতের মন্দাও কিছুটা কমেছে। তবে ব্রিটেনের উৎপাদন খাত মার্চে বেশ খারাপ সময় পার করেছে। সেখানে শুল্কের আশঙ্কা ও আসন্ন কর বৃদ্ধির ফলে কমে গিয়েছে নতুন অর্ডারের প্রবাহ, কমেছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আশাবাদও।
বিনিয়োগকারীদের মাঝে এখনো উদ্বেগ থাকলেও মঙ্গলবার বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে দেখা গেছে উত্থান। কারণ রাতভর ইতিবাচক প্রবণতা দেখিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট। পাশাপাশি স্বর্ণের মূল্য নতুন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। তবে অন্যান্য সূচক ছিল দুর্বল। দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানি প্রত্যাশার তুলনায় কম বেড়েছে। জাপানের গুরুত্বপূর্ণ টানকান জরিপ দেখিয়েছে, বড় উৎপাদকদের ব্যবসায়িক মনোভাব এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ট্রাম্পের এ শুল্ক ঘোষণা ঘিরে কানাডা ও মেক্সিকোও প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তারা রয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম জানিয়েছেন, তারা কোনো চোখের বদলে চোখ নীতি অনুসরণ করবেন না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানান, তারা এমন শুল্ক আরোপ করবেন যা আমেরিকাকে বেশি প্রভাবিত করবে। এত কিছুর মধ্যেও যদি শুল্ক আরোপ হয় তাহলে তা আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ দেশ তিনটি ইউএসএমসিএ (যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি) চুক্তিতে আবদ্ধ।